শনিবার | ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ | ১৪ই মাঘ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ



সত্যের পথে অবিচল | ২৪ ঘণ্টা বাংলা সংবাদ

গাইবান্ধায় মিতুর ১ সেলাই মেশিনে শুরু, এখন সাবলম্বী ৬শ নারী

নিজশ্ব প্রতিনিধী

গাইবান্ধায় মিতুর ১ সেলাই মেশিনে শুরু, এখন সাবলম্বী ৬শ নারী

গাইবান্ধায় মিতুর ১ সেলাই মেশিনে শুরু, এখন সাবলম্বী ৬শ নারী


নিভৃত গ্রামাঞ্চলের নারী মিতু বেগম। একজন সফল উদ্যোক্তা হবেন এমন স্বপ্ন বুনেন। আর সেই স্বপ্নের বাস্তবরূপও দিয়েছেন। একটি সেলাই মেশিন দিয়ে শুরু করে মিনি গার্মেন্টস কারখানা গড়ে তুলেছেন। এরই মধ্যে অন্যদেরও স্বপ্ন দেখিয়ে এখন ৬ শতাধিক নারী তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

এই উদ্যোক্তা মিতু বেগমের বাড়ী গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার নুনিয়াগাড়ী গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মিজানুর রহমানের স্ত্রী।

বুধবার (২৬ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায় মিতু বেগম তার গার্মেন্টেসে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নারী শ্রমিকরাও সারিবদ্ধভাবে বসে আপন খেয়ালে কাজ করছেন।


জানা যায়, গত ২০০৯ সালে প্রথম একটি সেলাই মেশিন নিয়ে কাটিং ও সেলাই, হাতের কাজ, এপ্লিকের কাজ, নকশিকাঁথা, নকশি বেডশিট, বেডশিট, বুটিকের ড্রেস, চাদর, পর্দা, কুশন ও টেবিল ম‍্যাট তৈরি করে স্থানীয়ভাবে বাজারজাত করতেন। এভাবে যখন যেটার অর্ডার পেতেন সেই কাজ করতে থাকতেন মিতু। এভাবেই কাজ এগিয়ে যেতে থাকে মিতুর ঘরোয়া মিনি কারখানার। এর সঙ্গে দিনদিনে বৃদ্ধি হতে থাকে নারী শ্রমিকের।

এরপর মিতু গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পের আওতায় বিআরডিবি পলাশবাড়ী উপজেলা শাখার মাধ্যমে ৩০ দিনের এমব্রয়ডারি প্রশিক্ষণ নেন। পাশাপাশি নিজের কারখানার নারীদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে তাদেরও পলাশবাড়ী বিআরডিবি অফিসের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের সুযোগ করে দেন।


ব‍্যবসায়িক বুদ্ধি, রুচিবোধ, গ্রাহকের মানসিকতা ও সূজনশীল চেতনা থাকার কারণে তার তৈরি পণ্যের মান বেশ ভালো। এ কারণে জেলা-উপজেলার গন্ডি পেরিয়ে ঢাকা নিউ মার্কেট ও আড়ং থেকে একের পর এক অর্ডার আসতে থাকে। তাদের কথামত অর্ডার অনুযায়ী কাজ করতে গিয়ে নারী শ্রমিক আরও বৃদ্ধি করতে হয়। বতর্মানে কারখানায় এবং বাড়িতে কাজ করছেন ৬০০ নারী শ্রমিক। মাসে কাপড়ের বিভিন্ন কাজের অর্ডার আসে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার পিসের।

আগে মিতুর সংসারে একটু টানপোড়েন থাকায় এবং মায়েদের শিখানো হাতের কাজ সম্বল করে শাড়ীতে পুঁথি বসানো, জরির কাজ, নকশিকাঁথা,পাঞ্জাবি, বেডশীট, ম‍্যাক্সি, স্কার্ট, স্কার্ফ, বিয়ের পোশাক, লেহেঙ্গা, বোরকা,নপহেলা বৈশাখ ও পহেলা ফাগুনের পোশাক, বালিশের কভার, ডাইনিং সেটসহ ঘর সাজানোর আইটেম তৈরি করতেন প্রথমে। সাধ‍্যের মধ্যে যতটুকু পেরেছেন অন্যদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করে চলছেন।

কারখানাটিতে দেখা যায়, নারী শ্রমিকেরা গোল হয়ে এবং সারিবদ্ধভাবে সুই-সুতো, জরি, জামার ওপর গ্লাসের কাজ করছেন। এছাড়াও বেডশিট, কুশন, শাড়ী, ওড়না, টি-শার্ট, পাঞ্জাবি, নকশিকাঁথা, সেলোয়ার-কামিজের ওপর বিভিন্ন নকশা দিয়ে কাজ করছেন। কোনো কোনো নারী কাপড় বাড়িতে নিয়ে গিয়ে কাজ করে জমা দিয়ে পারিশ্রমিক নিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে ভ্রাম‍্যমাণভাবে আরও ২০০ নারী কাজ করে থাকেন। তারা সংসারের কাজ সেরে দুটি টাকা অতিরিক্ত আয়ের আশায় নিথর বসে না থেকে মিতুর কারখানার কাপড় নিয়ে গিয়ে বাড়িতে কাজ করে জমা দিয়ে যাচ্ছেন। আবার কাপড় নিয়ে যাচ্ছেন। এতে করে অনেকেই এখন স্বামীর বোঝা না হয়ে নিজের হাত খরচ মিটিয়ে স্বামীর হাতে মাসের শেষে কিংবা সপ্তাহে কিছু টাকা ধরিয়ে দিতে পারছেন। এতে করে সংসারেও সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। স্বামীদের ভালোবাসা পাচ্ছেন অনেক নারী।

শ্রমিক তাজমিনা আকতার বলেন, ‘আমার সংসারে খুবই অভাব ছিল। কোনো কূল-কিনারা করতে পারছিলাম না। কাজও তেমন একটা জানা ছিল না। ২০১৬ সালে আমার এক প্রতিবেশীর মাধ্যমে পরিচয় হয় মিতু আপার সঙ্গে। তিনি আমাকে পলাশবাড়ী বিআরডিবি অফিসের এমব্রয়ডারি প্রশিক্ষণ নেওয়ায়। এরপর কারখানায় যোগদান করায়। সেই থেকে আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া শিখাতে পারছি।’

রুমি বেগম বলেন, ‘আমার সংসারে অনেক কিছুর ঘাটতি ছিল। মিতু আপা আমাকে বিআরডিবি থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দিয়ে তার কারখানায় কাজ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন। আমি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। আমি নিজের চাহিদা মিটিয়ে স্বামীর হাতে দুটো টাকা তুলে দিতে পারছি। এটাই কম কিসের।’

এদিকে, কারখানা চালাতে মিতুকে সহযোগিতা করছেন তার চাচাতো বোন মুক্তা। তিনি বলেন, ‘আমি মিতু আপুর কারখানার যেসব নারী শ্রমিক বাড়িতে কাপড় নিয়ে গিয়ে কাজ করে তাদের নাম রেজিস্ট্রার বইয়ে লিপিবদ্ধ করি এবং কাপড়ের পরিমাণ লিখি। পাশাপাশি রিজেক্ট কাপড় বাছাই করি। অনেক নারী শ্রমিক আছেন যারা একটু ভুল করেছেন। আমি সেই ভুলগুলো ধরে তাদের নিকট কাজ করে নেই।’

সফল এই নারী উদ্যোক্তা মিতু বলেন, ‘জীবনে কোনো কিছুই সহজ পথে আসে না। প্রতিটি পথেই কাঁটা বিছানো থাকে। আর তা উপরে ফেলার সাহস যাদের আছে কেবল তারাই জয়ী হবেন। আজ আমি সফল হয়েছি। দেশের বিভিন্ন ফ‍্যাশন হাউস, মার্কেট থেকে বড় বড় অর্ডার আসে আমার কাছে। তাদের চুক্তি মোতাবেক সঠিক সময়ে মানসম্মত মাল বুঝে দিতে হয়। এভাবে কাজ করে প্রতিমাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা লাভ থাকে।’

পলাশবাড়ী উপজেলা বিআরডিবি কর্মকর্তা হাসানুজ্জামান জানান, গাইবান্ধা সমন্বিত পল্লী দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রকল্পের ভিশন পণ্য ভিত্তিক পল্লী গঠনের লক্ষ্যে এমব্রয়ডারি ট্রেডে একমাস মেয়াদী প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই প্রশিক্ষণ নিয়ে মিতু নিজ চেষ্টায় স্বাবলম্বী হয়েছেন। তাকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সহযোগিতা করা হয়েছে। তার মতো অন্যরা চাইলে উপজেলা বিআরডিবির পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

Facebook Comments Box

Posted ৮:০৯ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ২৮ অক্টোবর ২০২২

protidinerkushtia.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

এ বিভাগের আরও খবর

মোঃ শামীম আসরাফ, সম্পাদক ও প্রকাশক
বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় :

ঝাউদিয়া বাবলু বাজার, দৌলতপুর, কুষ্টিয়া ফোনঃ +৮৮ ০১৭৬৩-৮৪৩৫৮৮ ই-মেইল: protidinarkushtia@gmail.com

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ে নিবন্ধনের জন্য আবেদনকৃত
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি
error: Content is protected !!